Dhaka, শনিবার, এপ্রিল ৫, ২০২৫

পোল্যান্ডের পার্লামেন্টে ‘আশ্রয় অধিকার’ স্থগিতের বিল পাস

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫, ১০:৩০ পিএম
Bangla Today News

পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ড প্রতিবেশী বেলারুশ থেকে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের আশ্রয় স্থগিত করতে চায়। সম্প্রতি দেশটির সংসদের নিম্নকক্ষ সেইমে এ সংক্রান্ত একটি বিল পাস করেছে। বিলটি আইন আকারে পাস হলে বেলারুশ সীমান্ত দিয়ে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের আশ্রয় অধিকার সাময়িকভাবে স্থগিত করার অনুমতি পাবে পোলিশ সরকার।

দেশটির সরকার গত বছরের অক্টোবরে একটি নতুন অভিবাসন কৌশল গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো অনিয়মিত অভিবাসীদের সংখ্যা কমানো এবং অভিবাসন প্রক্রিয়াকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

এই কৌশলের মধ‍্যে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসাবে বিবেচিতদের আশ্রয় আবেদন সাময়িক স্থগিত করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পোল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পিএপি জানিয়েছে, ২০ ফেব্রুয়ারি সংসদের নিম্নকক্ষ ‘সেইম’ ৩৮৬-৩৮ ভোটে এই বিলটিতে অনুমোদন দিয়েছে। ভোটদানে বিরত ছিলেন না কোনো আইনপ্রণেতা।

এখন বিলটি পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে পাঠানো হবে। এরপর বিলটি নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের পর সিনেট সদস‍্যরা অনুমোদন দিলেই প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হবে। প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করলেই এটি আইনে রূপ নেবে।

আইনটি পোলিশ সরকারকে তার সীমান্তের নির্দিষ্ট অংশে ৬০ দিন পর্যন্ত আশ্রয় প্রার্থনার অধিকার স্থগিত করার অনুমতি দেবে। পার্লামেন্টের অনুমোদনের মাধ্যমে এই সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে এবং তা অনির্দিষ্টকালও হতে পারে।

বিশেষ বিবেচনায় কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও রাখা হয়েছে আইনটিতে। বিশেষ করে অভিভাবকবিহীন শিশু, সন্তানসম্ভবা নারী এবং বয়স বা স্বাস্থ্যগত কারণে যাদের বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন তাদের আশ্রয় চাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। এছাড়া কোনো অভিবাসী যদি প্রমাণ দিতে পারেন যে, তাকে বেলারুশে ফেরত পাঠানো হলে তার জীবন গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে, তাহলে তাকেও আশ্রয় চাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য আশ্রয় অধিকার নিশ্চিত করাসহ বামপন্থিরা আইনটিতে তিনটি সংশোধন আনার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সরকার সমর্থিত আইনপ্রণেতারা তা গ্রহণ করেননি।

পোলিশ সরকারের নতুন এই আইনের সমালোচনা করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হেলসিংকি ফাউন্ডেশন ফর হিউম্যান রাইটস এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইউরোপ এবং মধ্য এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র গবেষক লিডিয়া গল বলেছেন, বর্তমানে ইইউ প্রেসিডেন্সির দায়িত্ব পালনকারী দেশ হিসাবে পোল্যান্ডের উচিত উদাহরণ তৈরি করা এবং নিশ্চিত করা যে, যুদ্ধ ও নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা মানুষেরা আশ্রয় চাওয়ার সুযোগ পাবেন।

গল আরো বলেন, বিতর্কিত বিলটির ক্ষেত্রে পোল্যান্ডের উচিত আন্তর্জাতিক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাধ্যবাধকতা মেনে চলা এবং এটি বাতিল করা। এইচআরডিব্লিউ বলছে, এই পদক্ষেপটি বেলারুশের সঙ্গে থাকা পোল্যান্ড সীমান্তে ‘‘চলমান বেআইনি এবং অপমানজনক পুশব্যাকগুলোকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।’’

সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘‘এটি বেলারুশে মানুষকে নির্যাতন এবং অমানবিক অবস্থার মুখোমুখি করবে, যা নন-রিফাউলমেন্ট নীতিরও লঙ্ঘন। কারণ এই নীতি অনুসারে একজন ব্যক্তিকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তিনি নির্যাতন বা অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শিকার হতে পারেন।’’

এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে বেলারুশ ‘‘তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ভিসা সহজ করছে এবং তাদেরকে পোল্যান্ড ভ্রমণে উৎসাহিতও করছে, এমনকি জোরও করছে।’’

পোলিশ সরকার বলছে, বেলারুশ এবং রাশিয়া অভিবাসীদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই আশ্রয় অধিকার স্থগিত করা গুরুত্বপূর্ণ। পোলিশ প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্ক চলতি মাসেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন অভিবাসন চুক্তির বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, তার সরকার ইউরোপের অন্য দেশে আসা অভিবাসীদের গ্রহণে প্রয়োজনীয় কোনো উদ্যোগ নেবে না।

অক্টোবরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে পোল্যান্ডের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, রাশিয়া এবং তার মিত্র বেলারুশকে ইউরোপীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

গত বছরের এপ্রিলে টুস্ক বলেছেন, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে অনুমোদিত হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন স্থানান্তর ব্যবস্থায় সম্মত নয় পোল্যান্ড।

গত বছরের ১৬ অক্টোবর অনিয়মিত অভিবাসীদের আশ্রয়ের অধিকার স্থগিত করতে পোল্যান্ড সরকারের নেয়া বিতর্কিত পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছেন পোলিশ প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই দুদা। ওইদিন সরকারের পরিকল্পনাকে ‘মারাত্মক ভুল’ বলে অভিহিত করেছিলেন তিনি।

সরকারের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের প্রয়োজন। আন্দ্রেই দুদা বলেছেন, এর ফলে রাশিয়া এবং প্রতিবেশী বেলারুশ সরকারের বিরোধিতাকারী মানুষেরা যখন নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পোল্যান্ডে আসতে চাইবেন, তখন তারাও বাধার মুখে পড়বেন।

তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টুস্ক জবাবে বলেছেন, ‘‘এই সিদ্ধান্ত ভিন্নমতাবলম্বীদের জন্য প্রযোজ্য হবে না।’’ 

২০২১ সাল থেকে প্রতিবেশী বেলারুশের সীমান্ত দিয়ে অনথিভুক্ত অভিবাসীরা পোল্যান্ডে ঢোকার চেষ্টা শুরু করেন। অনিয়মিত অভিবাসীদের এই প্রবাহের জন্য রাশিয়া ও বেলারুশকে দায়ী করে পোল্যান্ডের তৎকালিন সরকার।

পোলিশ সরকারের দাবি, এর মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে রাশিয়া ও বেলারুশ। এটিকে ‘হাইব্রিড আক্রমণ’ বলে উল্লেখ করেছে পোল্যান্ড। তবে পোলিশ সরকারের এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে মিনস্ক ও মস্কো। ইনফোমাইগ্রেন্টস।

 

Leave a comment